ঢাকা , শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাথমিকের পাঠদান ব্যহত

জামালপুরে ৫৪০টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৩:৫৮:০২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৩:৫৮:০২ অপরাহ্ন
জামালপুরে ৫৪০টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক ছবি : সংগৃহীত
জামালপুর পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয় ২০১৩ সালে। কিন্তু জাতীয়করণের এক যুগ পার হলেও বিদ্যালয়টিতে কখনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে একজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে।

এ সংকট শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, বর্তমানে জেলার ৫৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকশূন্য। কোথাও সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কোথাও সহকারী শিক্ষকের পদও খালি থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ না হলে জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংকট আরও গভীর হবে।

গত বছরের ১৫ জুলাই প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রধান শিক্ষকের ৬৫ হাজারের বেশি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি পদই শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক।

১৯ জুলাই জামালপুর পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সূরাফীয়া আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। আর ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়। বিদ্যালয়ে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক আছেন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে বিভিন্ন সময় অন্য শিক্ষকেরাও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়টিতে ৯৪ জন শিক্ষার্থী আছে। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত পাঠদান করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজও আমাকে সামলাতে হয়। ফলে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। আমরা চাই, একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।’

পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সদর উপজেলার খুপীবাড়ী, চালাপাড়া, তীর্থ সত্যপীর, বকশীগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া উমর এবং মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য আছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টন, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিখন কার্যক্রমের নিয়মিত তদারকি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রণয়ন, আর্থিক ও দাপ্তরিক কাজ, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনায়ও নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জামালপুর প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১ হাজার ১৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের সংখ্যা ১ হাজার ১৬৪টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬২৪ জন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ৫৪০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার ৪৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৬ হাজার ৩১৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৫ হাজার ৯৬৬ জন। অর্থাৎ ৩৪৮টি সহকারী শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য আছে।

খুপীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করছি। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানও চালিয়ে যেতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও পড়ে। আমরা চেষ্টা করলেও তারা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন।’

প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সমস্যা শুধু জামালপুরেই না, বরং সারা দেশেই আছে বলে মন্তব্য করেন জেলা সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ। তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর কিছু শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছিল। যে কারণে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছিল না। শুনেছি, ওই মামলাগুলোর সমাধান হচ্ছে। এতে আইনি জটিলতাও কেটে যাবে। ফলে শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক খুব দ্রুত নিয়োগ দেওয়া যাবে।’

প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রায় সব দায়িত্বই শিক্ষকদের ওপর এসে পড়েছে বলে জানান বকশীগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া উমর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. শিউলি আক্তার। তিনি বলেন, ‘অফিসের নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, হিসাব-নিকাশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ